বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমকে খোঁচা গ্লোবাল টাইমসের
‘বাংলাদেশের স্বাধীন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অযথা হইচইয়ের প্রয়োজন নেই’
চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইংরেজি দৈনিক গ্লোবাল টাইমস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমের সমালোচনা করেছে। পত্রিকাটি বলেছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ভারত নয়, চীন হওয়ায় ভারতীয় কিছু সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকের অসন্তোষ প্রকাশ একটি ‘বড় ভাই মানসিকতার’ প্রতিফলন। সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অযথা বিতর্ক তৈরি করার প্রয়োজন নেই।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত “Some Indian media outlets needn’t make a fuss about Bangladeshi PM’s China visit” শিরোনামের সম্পাদকীয়তে গ্লোবাল টাইমস এসব মন্তব্য করে।
নিচে সম্পাদকীয়টির বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো—
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত চীনে সরকারি সফর করবেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম চীন সফর। সফরের অংশ হিসেবে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ১৭তম অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস-এও অংশ নেবেন। ব্যস্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ এই সফরসূচি নতুন বাংলাদেশ সরকার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বাংলাদেশি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই সফরে দুই দেশ একাধিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করবে, যা পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনার প্রতিফলন।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পখাতের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করা এখন দেশের জরুরি অগ্রাধিকার।
টানা ১৬ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা মিলিয়ে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ১০০ শতাংশ শুল্ক লাইনে শূন্য শুল্ক সুবিধা চালু করেছে চীন, যার ফলে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণে বাংলাদেশি গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো সহযোগিতা, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং কৌশলগত সংলাপ জোরদার করা।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এই সফর চীন ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতারও একটি প্রতিচ্ছবি। চলতি মাসেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং চীন সফর করেন। সফরে দুই দেশ ‘চীন-মিয়ানমার অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে যৌথ বিবৃতি দেয়।
গত মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও চীন সফর করেন। তখন দুই দেশের নেতারা নতুন যুগে আরও ঘনিষ্ঠ চীন-পাকিস্তান অভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্প্রদায় গঠনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে একমত হন।
এছাড়া তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রহমান এবং ব্রুনাইয়ের যুবরাজ হাজি আল-মুহতাদী বিল্লাহ পর্যায়ক্রমে চীন সফর করে জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও অন্যান্য খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নিয়েছেন। এপ্রিলে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রেসিডেন্ট তো লাম চীন সফরকালে সীমান্তবর্তী অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ এবং ডিজিটাল শিল্পে একাধিক সমঝোতায় পৌঁছান।
দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য সামার দাভোস ফোরামেও প্রতিবেশী দেশের নেতারা অংশ নেবেন। উচ্চপর্যায়ের এই সফরগুলোর ধারাবাহিকতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বহু দেশ চীনের উন্নয়ন থেকে সৃষ্ট সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফরও সেই বৃহত্তর ধারারই অংশ।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নয় এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের প্রভাবে পরিচালিতও হওয়া উচিত নয়। এটি বরাবরই চীনের নীতিগত অবস্থান।
তবে গ্লোবাল টাইমস দাবি করেছে, ভারতের কিছু গণমাধ্যম বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর ভারত নয়, চীন হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে তারেক রহমান প্রতিবেশী ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীনকে বেছে নিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, বাংলাদেশ-চীন পানি ব্যবস্থাপনা সহযোগিতা “নয়াদিল্লির জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল”।
এসব মন্তব্যের পেছনে কিছু ভারতীয় মহলে বিদ্যমান ‘বড় ভাই’ মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায় বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, তারা মনে করেন প্রতিবেশী দেশের কোনো নেতার প্রথম বিদেশ সফর ভারতে হওয়া উচিত, যেন তা আঞ্চলিক অভিভাবকের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ। অন্যদিকে কোনো দেশ স্বাধীনভাবে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিলে সেটিকে তারা নিজেদের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, চীন যেমন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়, তেমনি ভারতের সঙ্গেও বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তুলতে আগ্রহী। চীন ও ভারতের উচিত বন্ধু, প্রতিবেশী এবং পারস্পরিক সাফল্যের অংশীদার হওয়া—যাকে প্রায়ই ‘ড্রাগন-এলিফ্যান্ট ট্যাঙ্গো’ বলে বর্ণনা করা হয়।
একই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকেও চীন স্বাগত জানায়। এসব সম্পর্ক পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া এমন একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম, যা সংশ্লিষ্ট সব দেশের জন্য সুফল বয়ে আনবে।
চীন উন্মুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিশ্বাসী। চীন-ভারত বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডর কিংবা চীন-বাংলাদেশ সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা—কোনোটিই কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। বরং এগুলো পারস্পরিক লাভজনক বহুপাক্ষিক সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত।
উদাহরণ হিসেবে তিস্তা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশ একই নদীর উজান ও ভাটির দেশ। অন্যদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সঙ্গে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করছে। একইভাবে চীন ও ভারতের মধ্যেও আন্তঃসীমান্ত নদীর জলবিদ্যা পর্যবেক্ষণ এবং বন্যা সংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের মতো বিষয়ে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে। ফলে এই খাতে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতারও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
সবশেষে গ্লোবাল টাইমস বলেছে, বর্তমানে উন্নয়নের লক্ষ্যে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা একটি অনস্বীকার্য প্রবণতা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অভিন্ন অগ্রাধিকার হলো জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা। চীন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতি এবং সব দেশের সমান মর্যাদার নীতিতে অটল থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে চায়। একই সঙ্গে তারা আশা প্রকাশ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আরও গভীর সহযোগিতা, অভিন্ন সমৃদ্ধি এবং পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে যৌথ উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
