ভারত কি সত্যিই বাংলাদেশকে বন্ধু মনে করে? প্রশ্নটি আজ আর আবেগের নয়, বরং বাস্তবতার। কারণ বন্ধুত্ব শুধু মুখের কথায় প্রমাণিত হয় না; বন্ধুত্ব প্রমাণিত হয় আচরণে, নীতিতে, পারস্পরিক সম্মানে এবং একে অপরের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের নানা আচরণ, সীমান্তঘেঁষা সামরিক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক আশ্রয়নীতি, অভিবাসন ইস্যু, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় পরোক্ষ উৎসাহ এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি অস্বস্তি—এসব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মনে যৌক্তিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে: ভারত বাংলাদেশকে বন্ধু ভাবে, নাকি প্রভাবাধীন একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়?
বাংলাদেশের চারপাশে ভারতের সামরিক অবকাঠামো বৃদ্ধি উদ্বেগের বিষয়। সিলেট সীমান্ত থেকে প্রায় ১৩০-১৫০ কিলোমিটারের মধ্যে ব্রাহ্মস মিসাইল সংশ্লিষ্ট স্থাপনা, শিলিগুড়ি করিডর ঘিরে সামরিক প্রস্তুতি বৃদ্ধি, উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে মোতায়েন সক্ষমতা বাড়ানো, পানাগড়সহ বিভিন্ন বিমানঘাঁটি ও লজিস্টিক সুবিধা আধুনিকায়ন—এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশ স্বাভাবিকভাবেই পর্যবেক্ষণ করবে। ভারত নিশ্চয়ই বলবে এগুলো তাদের নিরাপত্তা প্রয়োজনের অংশ। কিন্তু একই প্রশ্ন বাংলাদেশও করতে পারে—একটি প্রতিবেশী বন্ধুর সীমান্তঘেঁষে এমন সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কি আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, নাকি নিরাপত্তা সন্দেহ বাড়ায়?
বাংলাদেশ কোনো দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসী নীতি নেয়নি। বাংলাদেশ ভারতের ভূখণ্ড চায় না, কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। কিন্তু বাংলাদেশ নিজের সীমান্ত, আকাশ, সমুদ্র, অর্থনীতি ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত রক্ষায় দৃঢ় থাকবে। ভারত যদি নিজের নিরাপত্তার নামে যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র, বিমানঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো বাড়াতে পারে, তাহলে বাংলাদেশও নিজস্ব নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করবে, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করবে, নৌ সক্ষমতা বাড়াবে, মিসাইল সক্ষমতা উন্নয়ন করবে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করবে। এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; এটি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অধিকার।
প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে যুদ্ধবিমান কিনবে, কোন দেশ থেকে মিসাইল বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম নেবে, কার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে, সেটি কি অন্য কোনো রাষ্ট্রের অনুমতির বিষয়? ভারত যখন রাফায়েল কিনেছে, ব্রাহ্মস মোতায়েন করেছে, রাশিয়া, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গড়েছে, তখন কি সে প্রতিবেশীদের অনুমতি নিয়েছে? নেয়নি। তাহলে বাংলাদেশ কেন নিজের প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত নিতে গেলে কারও অস্বস্তি বিবেচনা করবে?
সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি মানে হলো—বাংলাদেশ নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক গড়বে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ এবং ভারত—সবার সঙ্গেই বাংলাদেশ সম্পর্ক রাখবে, তবে সেটি হবে বাংলাদেশের স্বার্থের ভিত্তিতে। কারও খুশি বা অখুশি হওয়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে না। বাংলাদেশ কারও ব্লকে যাবে না, কারও অধীনতাও মেনে নেবে না। বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত স্পষ্ট: সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে অধীনতা নয়।
ভারতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার আচরণ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব প্রতিবেশীর সঙ্গেই ভারতের সম্পর্ক কখনো না কখনো অবিশ্বাস, চাপ, প্রভাব বিস্তার বা অস্বস্তির মধ্যে পড়েছে। এর মূল কারণ হলো ভারতের একধরনের বড়ভাইসুলভ মনোভাব। তারা নিজেদের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক স্বার্থকে স্বাভাবিক মনে করে; কিন্তু প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো একইভাবে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইলে সেটিকে সন্দেহের চোখে দেখে। এই মানসিকতা বন্ধুত্ব তৈরি করে না, বরং দূরত্ব তৈরি করে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক কিছু আচরণ আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সীমান্তে কথিত “পুশ-ইন” কোনোভাবেই বন্ধুসুলভ বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারসম্মত আচরণ হতে পারে না। কোনো ব্যক্তিকে যদি বাংলাদেশি নাগরিক বলে সন্দেহ হয়, তাহলে তার পরিচয় যাচাইয়ের জন্য কূটনৈতিক পদ্ধতি আছে, কনস্যুলার চ্যানেল আছে, নথিপত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে পাঠানো কোনো সভ্য রাষ্ট্রীয় আচরণ নয়। এটি শুধু মানবিক নয়, কূটনৈতিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য।
বাংলাদেশের সংখ্যালঘু ইস্যু নিয়েও ভারতের কিছু মহল যে ধরনের বক্তব্য, প্রচারণা বা রাজনৈতিক চাপ তৈরি করে, সেটিও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের সঙ্গে যায় না। বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। কিন্তু কোনো বাহ্যিক শক্তি যদি এই ইস্যুকে রাজনৈতিক চাপ, কূটনৈতিক অস্ত্র বা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান। সংখ্যালঘু সুরক্ষা মানবিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব; কিন্তু সেটিকে ভূরাজনৈতিক চাপের উপকরণ বানানো অগ্রহণযোগ্য।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ বা প্রত্যাখ্যাত রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি ভারতের মাটিতে আশ্রয়, প্ল্যাটফর্ম বা প্রচারণার সুযোগ পায়, তাহলে তা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ হিসেবে দেখা যায় না। বাংলাদেশের জনগণ যে রাজনৈতিক শক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, যে শক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনলাইন সভা, বক্তব্য প্রচার বা রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশের মানুষের মনে প্রশ্ন উঠবেই—ভারত কি বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান করছে, নাকি নিজের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব রাখতে চাইছে?
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের চীন সফর, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এসব বিষয়ে ভারতের অস্বস্তি প্রকাশ করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দিল্লির অনুমোদনে চলবে না। ঢাকা নিজের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রয়োজন, নিরাপত্তা বাস্তবতা এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পর্ক গড়বে।
বাংলাদেশের শক্তি শুধু সামরিক নয়; বাংলাদেশের শক্তি তার ভূগোল, জনগণ, অর্থনীতি এবং কৌশলগত অবস্থান। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের হাতে একটি বিরাট ভূরাজনৈতিক সম্পদ। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান এখন অনেক বড় শক্তির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর-পূর্ব ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশকে দুর্বল বা নির্ভরশীল ভাবার দিন শেষ।
কেউ যদি মনে করে সামরিক ভয় দেখিয়ে বাংলাদেশকে চাপে রাখা যাবে, তাহলে সেটি ভুল ধারণা। বাংলাদেশ যুদ্ধ চায় না, সংঘাত চায় না, সীমান্তে উত্তেজনা চায় না। কিন্তু বাংলাদেশের আত্মসম্মান, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে খেলা হলে জনগণ নিশ্চুপ থাকবে না। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, আনসার, প্যারামিলিটারি কাঠামো এবং সর্বোপরি দেশের জনগণ—জাতীয় প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ হতে জানে। এই দেশ আক্রমণাত্মক নয়, কিন্তু আত্মরক্ষার প্রশ্নে দুর্বলও নয়।
বাংলাদেশের অবস্থান হওয়া উচিত পরিষ্কার ও দৃঢ়। ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই, কিন্তু সেই সম্পর্ক হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে। একতরফা প্রত্যাশা, রাজনৈতিক চাপ, সামরিক প্রদর্শন, সীমান্তে অমানবিক আচরণ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার বা সাম্প্রদায়িক ইস্যু ব্যবহার করে সম্পর্ক টেকসই করা যায় না। বন্ধুত্ব চাইলে বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে। বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার, বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকে সম্মান করতে হবে।
অতএব বাংলাদেশের বার্তা স্পষ্ট: আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে। আমরা শান্তি চাই, কিন্তু আত্মসমর্পণ নয়। আমরা সহযোগিতা চাই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ নয়। আমরা বন্ধুত্ব চাই, কিন্তু প্রভুত্ব নয়। বাংলাদেশ তার সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী গড়ে তুলবে। এটিই স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার, এটিই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ, এটিই স্বার্বভৌম পররাষ্ট্র নীতি, এবং এটিই “বাংলাদেশ ফার্স্ট” নীতির মূল কথা।
