মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি নতুন নয়, কিন্তু একটি নিষ্পাপ শিশুর অপমৃত্যুকে পুঁজি করে ভিনদেশে বসে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়ানোর ঘটনা কেবল জঘন্যই নয়, চরম অপরাধমূলকও। চট্টগ্রামের খুলশীতে ১২ বছরের শিশু শ্রাবন্তী ঘোষের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঠিক এমন এক নোংরা ও বিপজ্জনক মিথ্যাচারের খেলা শুরু হয়েছে। একটি তদন্তাধীন অপরাধমূলক ঘটনাকে জোর করে ‘সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন’ বা ‘ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার এই অপচেষ্টা তথ্যের অপব্যবহারের এক নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
গুজবের বয়ান: কাল্পনিক ‘মোহাম্মদ’ ও ধর্মান্তরের নাটক
সম্প্রতি এক্সে (সাবেক টুইটার) বেশ কিছু ভারতীয় ভেরিফাইড ও নন-ভেরিফাইড অ্যাকাউন্ট থেকে শ্রাবন্তী ঘোষের ছবি শেয়ার করে দাবি করা হচ্ছে, “মোহাম্মদ নামের ৪৯ বছর বয়সী এক মুসলিম ব্যক্তি শিশুটিকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করতে চেয়েছিল। পরিবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় কট্টরপন্থী মুসলিমরা তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে।” এই পোস্টগুলোতে শিশুটির মৃত্যুকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ‘দগদগে প্রমাণ’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাস্তবতা ও ফ্যাক্টচেক: অভিযুক্তরা নিজ ধর্মেরই মানুষ
কিন্তু পুলিশি তদন্ত, স্থানীয় গণমাধ্যম এবং খোদ নিহতে মায়ের বক্তব্য এই পুরো ভারতীয় ন্যারেটিভকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
গত ৪ জানুয়ারি ভোরে নিজ বাসা থেকে শ্রাবন্তীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতের মা ও পরিবার একে আত্মহত্যা মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোএই অভিযোগে নিহতের মা রোজী ঘোষ যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, তারা কেউ মুসলিম নন।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এই ঘটনায় আটক এবং অভিযুক্তরা হলেন—বাড়ির মালিক প্রদীপ লাল ঘোষ এবং প্রতিবেশী অজয় সিংহ। নাম শুনেই বোঝা যায়, অভিযুক্তরা সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মামলার এজাহারে আরও তিনজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হলেও সেখানে কোনো মুসলিম ব্যক্তির নাম বা সাম্প্রদায়িক কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই।
নিহত মায়ের জবানবন্দি: ‘আমার সন্দেহভাজনরা কেউ মুসলিম নন’
ভারতীয় প্রোপাগান্ডা মেশিনের দাবি করা ‘৪৯ বছরের মোহাম্মদ’ বা ‘বিয়ের প্রস্তাব’-এর বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন শিশুটির মা। তিনি গণমাধ্যম ও ফ্যাক্টচেকারদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, “এতটুকু বাচ্চার বিয়ের প্রস্তাব আসার দাবিটি অবান্তর। কোনো মুসলিম ব্যক্তির বিয়ের প্রস্তাব বা ধর্মান্তরের চেষ্টার ঘটনা ঘটেনি। আমি যাদের সন্দেহ করেছি এবং যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি, তারা কেউ মুসলিম নন। এই ঘটনার সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই।”
দৈনিক সমকালসহ দেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনেও দেখা যায়, শিশুটি ঘটনার রাতে বাসায় একা ছিল। পরে তার কাকা বাসায় ঢুকে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পায়। সেখানে ‘কট্টরপন্থী মুসলিমদের হামলা’র কোনো আলামত বা তথ্য পুলিশ বা পরিবার কেউ দেয়নি।
একটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী দেশের নেটিজেনরা যে গল্প ফেঁদেছে, তা সম্পূর্ণ মনগড়া। অভিযুক্তরা যেখানে হিন্দু ধর্মাবলম্বী (প্রদীপ ও অজয়), সেখানে কাল্পনিক ‘মুসলিম মোহাম্মদ’ চরিত্র তৈরি করে ঘটনাটিকে ‘জিহাদি হামলা’ বা ‘লাভ জিহাদ’ ঘরানার রূপ দেওয়া হয়েছে। এটি স্পষ্টত বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি সুপরিকল্পিত ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা তথ্যযুদ্ধ।
