নির্বাচনের ব্যালটে সিল মেরে বাড়ি ফেরার পর যদি শোনেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এখনই সরকার গঠন করবেন না, বরং আরও ছয় মাস বা ১৮০ দিন দেশ চালাবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কেমন লাগবে? ঠিক এমনই এক ভীতিকর ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পোস্ট’ তাদের একটি ভিডিও প্রতিবেদনে দাবি করেছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হওয়ার নাকি একটি বড় ‘সাইড এফেক্ট’ আছে, আর তা হলো ড. ইউনূসের সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি।
কিন্তু থামুন, আতঙ্কিত হওয়ার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কারণ, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আইনি নথি বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। এই দাবিটি কেবল ভুলই নয়, বরং সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি অতিরঞ্জিত ও মনগড়া ব্যাখ্যা।
গুজবের সূত্রপাত
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম ‘দ্য পোস্ট’ তাদের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে “গণভোট: ‘হ্যাঁ’ জিতলে আরও ৬ মাস ইউনূস সরকার; ‘না’ জিতলে কী?” শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করে। ভিডিওতে উপস্থাপক দাবি করেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে না। নির্বাচিত এমপিরা তখন কেবল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবে কাজ করবেন এবং সংবিধান কাটছাঁট করতে তাদের হাতে ১৮০ দিন সময় থাকবে। এই ছয় মাস নাকি অন্তর্বর্তী সরকারই ক্ষমতায় থেকে যাবে। ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয় এবং জনমনে নির্বাচন পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে।
বাস্তবতা ও ফ্যাক্টচেক
আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘দ্য পোস্ট’-এর এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন। ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর কোথাও এমন শর্ত নেই যে সংবিধান সংস্কার চলাকালীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকবে।
আদেশটির ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ‘দ্বৈত ভূমিকা’ (Dual Role)-র কথা বলা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ ৭-এর (১) (খ) উপ-ধারায় বলা হয়েছে:
“উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করিবেন।
এর অর্থ অত্যন্ত সহজ। নির্বাচনে যারা জয়ী হবেন, তারা একইসঙ্গে দুটি টুপি পরবেন:
১. সংসদ সদস্য: তারা সরকার গঠন করবেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।
২. সংস্কার পরিষদের সদস্য: তারা সংবিধান সংস্কারের কাজ করবেন।
অর্থাৎ, নির্বাচনের পর নির্বাচিত দলই সরকার গঠন করবে এবং দেশ পরিচালনা করবে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নির্বাচন আয়োজন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। নির্বাচিত এমপিরা যখন শপথ নেবেন, তখন থেকেই তারা সরকার হিসেবে কাজ শুরু করবেন। ১৮০ দিন বা ছয় মাস হলো সংবিধান সংস্কার কাজ শেষ করার সময়সীমা, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ নয়।
১৮০ দিনের সময়সীমা আসলে কীসের জন্য?
আদেশের ৭ (১) (গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংস্কার কাজ শেষ করতে হবে। কাজ শেষ হলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বিলুপ্ত হবে এবং এমপিরা তখন থেকে কেবল সাধারণ সংসদ সদস্য হিসেবেই তাদের মেয়াদ পূর্ণ করবেন। এই সময়ের মধ্যে দেশ পরিচালনার ভার নির্বাচিত সরকারের হাতেই থাকবে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে নয়।
সুতরাং, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে ড. ইউনূসের সরকার আরও ৬ মাস ক্ষমতায় থাকবে এই দাবিটি সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যাপ্রসূত। আইনের খসড়ায় স্পষ্ট বলা আছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সরকার গঠন করবেন এবং পাশাপাশি সংস্কার কাজ চালিয়ে যাবেন। তাই এ ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দেওয়ার জন্য পাঠকদের অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।
