জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট আয়োজন করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ কারণে এবারের নির্বাচনকে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ছাড়াই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দলটির প্রধান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। তাঁকে আশ্রয় দেওয়ায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভারতের প্রতি ক্ষোভ দেখা গেছে।
আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের সমর্থনের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কও টানাপোড়েনের মধ্যে রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে অন্যান্য রাজনৈতিক দল ভারত নিয়ে বক্তব্যে তুলনামূলকভাবে সতর্ক থাকলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা প্রকাশ্যেই ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরছেন। ভারতের আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের অভিযোগ তাদের বক্তব্যে নিয়মিত উঠে আসছে।
তবে একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহারে ভারতের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও স্টক ফটো প্ল্যাটফর্ম থেকে নেওয়া ছবি ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। ইশতেহারের একাধিক পাতায় ব্যবহৃত এসব ছবিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জামায়াতের ৯০ পৃষ্ঠার ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পুস্তিকার ৪৮ নম্বর পাতায় ‘খাদ্য’ শিরোনামে চাতালে ধান শুকানোর দৃশ্যে ব্যবহৃত ছবিটি ভারতের। ছবিটি কলকাতার ফটোসাংবাদিক দিবাকর রায়ের তোলা এবং তা আনস্প্ল্যাশ ডটকমে প্রকাশিত। অথচ বাংলাদেশে, বিশেষ করে নওগাঁসহ উত্তরাঞ্চলে ধান শুকানো ও চালকলের এমন দৃশ্য সহজেই ধারণ করা সম্ভব।

৫৪ নম্বর পাতায় ‘মানবসম্পদ ও জনজীবনের মৌলিক মানোন্নয়ন’ অংশে বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরে আদিবাসী সংস্কৃতির কোলাজে ব্যবহৃত সাঁওতাল নৃত্যশিল্পীদের ছবিটিও ভারতের। ছবিটি বিহার সরকারের পর্যটন বিভাগের ফেসবুক পেজসহ একাধিক ভারতীয় পোর্টালে পাওয়া গেছে।
৫৫ থেকে ৫৯ নম্বর পাতায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনার অংশে সরিষা খেতের পাশ দিয়ে স্কুলড্রেস পরা শিশুদের যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি ভারতের উত্তর প্রদেশ সরকারের শ্রমিক বিভাগ প্রকাশিত একটি ডকুমেন্টে পাওয়া যায়। ছবিটি ভারতের সরকারি ওয়েবসাইট পেনসিল ডট গভ ডট ইন–এর একটি পিডিএফে রয়েছে।

৬০ থেকে ৬২ নম্বর পাতায় ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ’ শিরোনামে ব্যবহৃত মা ও শিশুর ছবিটি ভারতের উত্তর প্রদেশভিত্তিক ‘সুলভ উপচার কেন্দ্র’ নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া।

এ ছাড়া ৭১ নম্বর পাতায় ‘ভূমি ব্যবস্থাপনা’ অংশে গ্রামীণ জনপদে রাখালের গরু নিয়ে যাওয়ার ছবিটি ভারতের। ছবিটি পিন্টারেস্টে প্রকাশিত এবং এর ফটোগ্রাফার বেঙ্গালুরু এলাকার বাসিন্দা। ৮১ নম্বর পাতায় ‘সমাজকল্যাণ’ অংশে ব্যবহৃত শাড়ি পরিহিত কর্মজীবী নারীর ছবিটিও ভারতের একটি এনজিও ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া, যা ইশতেহারে উল্টো করে প্রকাশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জেলে, সবজি চাষ, গ্রিনহাউস ও জনজীবনসংক্রান্ত আরও কিছু ছবি অনলাইন স্টক ফটো প্ল্যাটফর্ম থেকে নেওয়া বলে শনাক্ত হয়েছে।

ইশতেহারের পাশাপাশি জামায়াতের কিছু নির্বাচনী সমাবেশের ভিজ্যুয়াল বিশ্লেষণেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ছবির বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। এসব ছবিতে মানুষের মুখাবয়ব অস্বাভাবিকভাবে নিখুঁত, আলো–ছায়ার অসামঞ্জস্য এবং বাস্তবে অস্তিত্বহীন দৃশ্য দেখা যায়—যা সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত ছবির ক্ষেত্রে দেখা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়ে রাজনীতি করা একটি দলের ইশতেহারে ভারতের ছবি ও বিদেশি ভিজ্যুয়াল ব্যবহার রাজনৈতিকভাবে স্ববিরোধী বার্তা দেয়। তারা বলছেন, জামায়াত যদি সত্যিই বাংলাদেশের বৈচিত্র্য ও উদারতা তুলে ধরতে চায়, তাহলে দেশের ভেতর থেকেই এসব ছবি সংগ্রহ করা যেত।
জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে ‘সত্য ও ইসলামি আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনার’ কথা বলে আসছে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রকাশিত ইশতেহারে বিদেশি ছবি ও এআই ভিজ্যুয়াল ব্যবহারের বিষয়টি দলটির বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে ফারাক আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
