বাংলাদেশে গত ১৮ মাস ধরে গণমাধ্যমগুলো যে অভূতপূর্ব স্বাধীনতা ভোগ করছে, তার অপব্যবহার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা আবদুল্লাহ আল জাবেরের ‘গুলিবিদ্ধ’ হওয়ার ভুয়া খবরকে কেন্দ্র করে মূলধারার গণমাধ্যমের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এখন বড় তর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সচেতন মহল প্রশ্ন তুলছেন গণমাধ্যমের এই স্বাধীনতা কি তবে গুজব ছড়ানোর লাইসেন্স হয়ে দাঁড়িয়েছে?
ঘটনার সূত্রপাত
শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে গত শুক্রবার রাজধানীর যমুনার সামনে পুলিশের সঙ্গে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এসময় মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। জাবেরকে যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন তার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে লাল ব্যানারে ‘গুলিবিদ্ধ’ শব্দটি লিখে একটি পোস্ট দেওয়া হয়।
যাচাইহীন সাংবাদিকতার মহড়া
বিস্ময়কর বিষয় হলো, সেই ফেসবুক পোস্টের সত্যতা যাচাই না করেই দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন পোর্টাল ‘ব্রেকিং নিউজ’ ও ‘ফটোকার্ড’ প্রচার শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্রেফ ‘ক্লিক’ আর ‘ভিউ’ পাওয়ার নেশায় সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত ‘তথ্য যাচাই’ (Fact Check) পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়া হয়।
বাস্তবতা ও দাফতরিক বক্তব্য
পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয় যে, ঘটনাস্থলে কোনো ধরণের গুলি চালানো হয়নি। সরকারের নীতি অনুযায়ী, পুলিশ এখন আর কোনো প্রাণঘাতী (Lethal) অস্ত্র বহন করে না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরাও নিশ্চিত করেছেন যে, জাবেরসহ আহত ২৩ জনের কারো শরীরেই গুলির কোনো চিহ্ন নেই। তারা মূলত পুলিশের ধাওয়ায় বা সংঘর্ষের সময় পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছেন।
প্রেস সচিবের কড়া সমালোচনা
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম এই ঘটনাকে ‘ক্লিকবেইট সাংবাদিকতার ফল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন, “আমরা গণমাধ্যম থেকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করি। একটি ভুলেই দাঙ্গা কিংবা অরাজকতা তৈরি হতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাংবাদিকরা সরকার ও ক্ষমতাধরদের নীতি-নৈতিকতার সবক দিলেও নিজেদের পেশাদারিত্বের ঘাটতি নিয়ে তারা ‘আয়নায় তাকাতে’ চান না।
বিপজ্জনক অতীতের পুনরাবৃত্তি
সাংবাদিকতার এই নির্ভুলতার আকাল নতুন নয়। এর আগে মাইলস্টোন স্কুলের কাছে বিমানবাহিনীর বিমান বিধ্বস্তের সময় অপসাংবাদিকতার জেরে উপদেষ্টারা ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন। সচিবালয়েও মব তৈরির পেছনে এই ধরণের সেনসেশনাল নিউজ কাজ করেছিল। বর্তমান স্পর্শকাতর সময়ে জাবেরের ‘গুলিবিদ্ধ’ হওয়ার নাটকও একই ধরণের ভয়াবহ অরাজকতা তৈরির উপক্রম করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন দেশ একটি স্থিতিশীল অবস্থায় যাচ্ছে, তখন গণমাধ্যমের এমন দায়িত্বহীনতা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। স্রেফ অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সংবাদ পরিবেশন করা কোনোভাবেই পেশাদারিত্ব হতে পারে না।
দেশবাসীর দাবি, স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছে এবং জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে, সেই সংবাদমাধ্যমগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। সাংবাদিকতায় নির্ভুলতা ও নৈতিকতা ফিরে না আসলে এই স্বাধীনতা দেশের জন্য হিতৈষী না হয়ে বরং আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
