নিজের ঘরের আগুন নেভানোর মুরদ নেই, অথচ পড়শির ঘরে কাল্পনিক ধোঁয়া খুঁজতে সর্বদা ব্যস্ত ভারতীয় মিডিয়া। মণিপুর যখন জ্বলে কিংবা ভারতে যখন সংখ্যালঘুরা নিগৃহীত হয়, তখন তাদের গণমাধ্যম মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রসঙ্গ এলেই তাদের কলম দিয়ে শুধুই ‘জঙ্গি’, ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ আর ‘দেশবিরোধী’ প্রোপাগান্ডা বের হতে থাকে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে হেয় করতে এই ধারাবাহিক মিথ্যাচারের অংশ হিসেবেই এবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘কলকাতা ২৪x৭’ ফেঁদেছে এক নতুন কল্পকাহিনি।
গুজবের বয়ান: প্রমাণহীন এক ‘স্পাই থ্রিলার’
সম্প্রতি কলকাতা ২৪x৭ তাদের এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, পাকিস্তান থেকে নাকি বিশেষ বিমানে করে বাংলাদেশে দেদারসে অস্ত্র ও জঙ্গি প্রবেশ করছে! তাদের দাবিমতে, তাবলিগ জামাতের আড়ালে এই অনুপ্রবেশ ঘটছে এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশও জড়িত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করাচি থেকে সরাসরি ফ্লাইটে এসব আনা হচ্ছে। কোনো দালিলিক প্রমাণ, ফ্লাইট নম্বর বা সুনির্দিষ্ট তারিখ ছাড়াই এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে তারা ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে পরিবেশন করেছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে একটি ‘অকার্যকর’ ও ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
অনুসন্ধান ও বাস্তবতা: মিথ্যার ফানুস যেভাবে ফুটল
আমাদের গভীর অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রতিবেদনের আগাগোড়া পুরোটাই মনগড়া, ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ভারতীয় মিডিয়ার এই জালিয়াতি ধরা পড়েছে তিনটি প্রধান জায়গায়:
১. এভিয়েশন ট্র্যাকিং ও ‘ভুতুড়ে’ ফ্লাইট:
প্রতিবেদনে ‘করাচি থেকে সরাসরি ফ্লাইট’ এবং ‘বিশেষ বিমান পরিচালনা পর্ষদ’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে কোনো বিমান রাডারের নজর এড়িয়ে চলাচল করতে পারে না।
ফ্লাইট রাডার ২৪: আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ট্র্যাকিং সাইটগুলোতে গত কয়েক মাসে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে অস্ত্রবাহী কোনো কার্গো বা সন্দেহজনক চার্টার্ড বিমানের অবতরণের কোনো রেকর্ড নেই।
সিভিল এভিয়েশন: বাংলাদেশের সিভিল এভিয়েশনের তথ্যেও এমন কোনো ফ্লাইটের অস্তিত্ব নেই। আকাশসীমার নিরাপত্তা যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে আইকাও (ICAO)-এর নজরদারিতে থাকে, সেখানে এমন ‘ভুতুড়ে বিমান’ আসা কেবল ভারতীয় মিডিয়ার উর্বর মস্তিষ্কেই সম্ভব।
২. ছবির জালিয়াতি: কাশ্মীর পুলিশ ও এআই-এর ব্যবহার:
মিথ্যা ঢাকতে গিয়ে কলকাতা ২৪x৭ তাদের খবরের ফটোকার্ডে এমন একটি ছবি ব্যবহার করেছে, যা তাদের সাংবাদিকতার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে।
কাশ্মীর পুলিশ বাংলাদেশে? ব্যবহৃত ছবিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হেলমেটে স্পষ্ট লেখা ‘J&K POLICE’ (জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ)। ভারতের কাশ্মীরের পুলিশ কীভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ঘটনার ছবিতে আসে? এটি প্রমাণ করে তারা গুগলে পাওয়া ছবি বা এআই দিয়ে তৈরি ছবি যাচাই না করেই ব্যবহার করেছে।
এআই-এর কারসাজি: ছবির এক কোণায় লেখা রয়েছে ‘AI Graphics’। অর্থাৎ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি আর কাশ্মীরের পুলিশ দিয়ে তারা বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের নাটক সাজাতে চেয়েছে। এটি কেবল হলুদ সাংবাদিকতা নয়, বরং চরম জালিয়াতি।
৩. সেনাবাহিনী ও তাবলিগকে জড়ানোর অপচেষ্টা:
প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশ এবং তাবলিগ জামাতকে জড়ানো হয়েছে। এটি ভারতীয় মিডিয়ার পুরনো কৌশল। বাংলাদেশের মানুষের আবেগের জায়গা সেনাবাহিনী এবং ধর্ম এই দুই জায়গায় আঘাত করে তারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চায়। অথচ আন্তর্জাতিক বা দেশীয় কোনো নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমে এমন কোনো সংবাদ নেই। কলকাতা ২৪x৭ তাদের দাবির সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট সূত্র বা প্রমাণ হাজির করতে পারেনি, কেবল বেনামী ‘বিশ্লেষক’ আর ‘সূত্র’র দোহাই দিয়েছে।
বিশ্লেষণ: কেন এই অপপ্রচার?
ভারত প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মহলে হেয় করতে চায়। বিশেষ করে ৫ই আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে তারা মরিয়া।
মণিপুর থেকে নজর ঘোরানো: ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, বিশেষ করে মণিপুর ইস্যু থেকে আন্তর্জাতিক নজর ঘোরাতে বাংলাদেশকে ‘ইস্যু’ বানানো হচ্ছে।
সাম্প্রদায়িক কার্ড: পাকিস্তান ও ইসলামভীতি ছড়িয়ে তারা ভারতীয় জনমনে বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব জাগিয়ে রাখতে চায়।
ভারত প্রতিনিয়ত বাংলাদেশকে ‘জঙ্গিবাদের আখড়া’ এবং ‘সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে, যাতে তাদের নিজেদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো আড়ালে থাকে। পাকিস্তান থেকে অস্ত্র আসার এই ভুয়া খবর সেই পুরোনো ও জরাজীর্ণ ষড়যন্ত্রেরই অংশ। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করাই এদের মূল লক্ষ্য। কলকাতা ২৪x৭-এর প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ ভুয়া, এআই নির্ভর এবং বিদ্বেষপ্রসূত।
